পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এগিয়ে চীন

পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বা ক্লিন এনার্জি খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোকে পেছনে ফেলে দিয়েছে চীন।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানি বা ক্লিন এনার্জি খাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের দেশগুলোকে পেছনে ফেলে দিয়েছে চীন। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন, খনিজ প্রক্রিয়াকরণ, বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি ও জ্বালানি প্রযুক্তির প্রায় প্রতিটি খাতে এখন এশিয়ার বৃহত্তম এ অর্থনীতির আধিপত্য স্পষ্ট। বর্তমানে বিনিয়োগ ও উদ্ভাবনে চীন যে হারে অগ্রসর হচ্ছে, তাতে বিশ্বজুড়ে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎ চেহারা বদলে যেতে পারে বলে প্রত্যাশা কোনো কোনো বিশ্লেষকের। খবর দ্য ন্যাশনাল।

বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও পরিবেশসংক্রান্ত আপত্তির কারণে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি এখন অগ্রাধিকারভিত্তিক খাত। কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের রাজনৈতিক নেতাদের অনেকে একে ব্যয়বহুল ও অনির্ভরযোগ্য বলে সমালোচনা জারি রেখেছেন। একই সময়ে বিশ্বের বৃহত্তম নবায়নযোগ্য জ্বালানি অবকাঠামো গড়ে তুলেছে চীন।

চীনের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর দেশটিতে ৩৮০ গিগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ও ১৪০ গিগাওয়াট বায়ুবিদ্যুৎ স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে, যা যুক্তরাষ্ট্রের মোট সৌর সক্ষমতার প্রায় দ্বিগুণ।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানির খরচও সম্প্রতি উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে। ২০২০ সালে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারির দাম ছিল প্রতি কিলোওয়াট-ঘণ্টায় ১৩৭ ডলার, সেখানে চীনে তা ৬০ ডলারেরও নিচে নেমে এসেছে এখন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বাড়ছে এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের টারবাইন সরবরাহেও বিলম্ব দেখা দিচ্ছে।

পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে চীনের অগ্রগতির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে কাঁচামালের জোগান ও প্রক্রিয়াকরণে তাদের নিয়ন্ত্রণ। শুধু দুর্লভ খনিজ নয়, গ্রাফাইট, গ্যালিয়াম, জার্মেনিয়াম ও অ্যান্টিমনির মতো উপাদান সরবরাহেও চীন প্রায় একচেটিয়া অবস্থানে রয়েছে। এসব উপাদান ব্যাটারি, বৈদ্যুতিক মোটর, ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশ, অস্ত্রশস্ত্র ও পিইটি (পলিথিলিন টেরেফথালেট) বোতলের মতো শিল্পপণ্য তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ খাতে নিয়ন্ত্রণ থাকার কারণে বৈশ্বিক পরিচ্ছন্ন জ্বালানি সরঞ্জামের জোগান ব্যবস্থায় চীনকে এড়ানো প্রায় অসম্ভব বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় চীনের আধিপত্য শুধু নবায়নযোগ্য খাতে নয়, পারমাণবিক জ্বালানিতেও দেশটি এগিয়ে। বর্তমানে চীনে ৩৪ গিগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণাধীন, যেখানে দ্বিতীয় স্থানে থাকা ভারত নির্মাণ করছে মাত্র ৬ গিগাওয়াট।

বিদ্যুচ্চালিত গাড়ির (ইভি) ক্ষেত্রেও চীনের অবস্থান শক্তিশালী। দেশটিতে বর্তমানে প্রতি দুই গাড়ি ক্রেতার একজন ইভি কিনছেন। বিওয়াইডি, নিও, শাওমির মতো দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সাশ্রয়ী, উন্নত প্রযুক্তির ও দৃষ্টিনন্দন ইভি বাজারজাত করছে, যা মার্কিন ও ইউরোপীয় গাড়ি শিল্পকে চাপে ফেলছে।

২০২৪ সালে চীন জ্বালানি খাতের রূপান্তরে ৮০ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করেছে, যা যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য মিলেও করতে পারেনি। এ বিনিয়োগের মাধ্যমে চীন নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ব্যাটারি প্রযুক্তি, ইভি, পারমাণবিক শক্তি ও গ্রিড অবকাঠামোয় দ্রুত অগ্রগতি অর্জন করছে। ফলে জ্বালানি রূপান্তরের বৈশ্বিক নেতৃত্ব ক্রমেই তাদের হাতে চলে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সরকারি সহায়তা ও শক্তিশালী সাপ্লাই চেইনের মাধ্যমে চীন পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে নেতৃত্ব পেয়েছে। বিপরীতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ দীর্ঘদিন ধরে সিদ্ধান্তহীনতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাবে পিছিয়ে পড়েছে।

বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ডাটা সেন্টারসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর খাতগুলো দ্রুত বাড়ছে, যার জন্য প্রয়োজন বড় পরিসরে বিদ্যুতের সরবরাহ। এক্ষেত্রে বিদ্যুৎ যদি সাশ্রয়ী ও নিরবচ্ছিন্ন উপায়ে সরবরাহ করা যায়, তবে তা যেকোনো দেশের জন্য বড় প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা হয়ে দাঁড়ায়। এদিক থেকে চীন অনেকটাই এগিয়ে। কারণ দেশটি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক শক্তি ও শক্তিশালী গ্রিড ব্যবস্থার মাধ্যমে সুলভ ও পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ সক্ষমতা গড়ে তুলেছে, যা আধুনিক শিল্প ও প্রযুক্তি খাতে তাদের অগ্রগতি আরো বাড়িয়ে দিচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, পরিচ্ছন্ন জ্বালানিতে চীনের নেতৃত্ব এখন আর বিতর্কের বিষয় নয়, বরং বাস্তবতা। যার সঙ্গে বাকি দেশগুলোকে মানিয়ে নিতে হবে।

আরও